চোর - সুব্রত_মজুমদার
‘খুড়ুক’ করে একটা আওয়াজ হতেই ঘুমটা ভেঙ্গে যায় তপেনের। সারাদিন খাটাখাটনির পর একটু ঘুমোবারও জো নেই। অফিসে বড়সাহেব, ঘরে গিন্নি আর এই রাতের বেলা শান্তিতে একটু চোখ বুজতে গেলেই হতচ্ছাড়া ইঁদুরগুলোর জ্বালাতন। যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে চলে যেতে মন করে তপেনের। নেহাত জন্মছকে সন্ন্যাসযোগ নেই তাই বেরোতে পারেনি এতদিন।
শব্দটা আবার উঠল। বিরক্ত হয়ে বিছানা হতে উঠে আলো জ্বালল তপেন। কোথাও কিচ্ছু নেই। ভুত, ছার আর ইঁদুর একই গোত্রের, আলো জ্বাললেই মিলিয়ে যায়। এবার সারারাত চলুক ওদের হলুইন পার্টি।
ইঁদুর হয়ে জন্মানোই বোধহয় সবচেয়ে সুখের, না অফিসের চিন্তা না গিন্নির। সারারাত মজা এ পার্টি করো আর সকাল হতেই ঘুমাও নাক ডাকিয়ে । না ভুত না ভবিষ্যৎ।
সুগার আর প্রেসারটা বাড়ার পর হতেই যত সমস্যার সূত্রপাত। তারই ইনকামের টাকায় গুষ্টিশুদ্ধ লোক চর্ব্যচোষ্য খাবে আর তার বেলাতেই আঁটিসাটি। না খেয়ে খেয়ে দশায় মশা বসেছে, অফিসে গিয়েও মন বসে না। বড়বাবু বলেন, “আপনার তো দিনদিন উন্নতি হচ্ছে ধরবাবু। একটা মামুলি অ্যাকাউন্ট মেলাতে সাঁইত্রিশটা ভুল। আপনি বরং স্বেচ্ছাবসর নিয়ে নিন।”
হুঁ স্বেচ্ছাবসর ! তাহলে তো গতরে ছাতা পড়ে যাবে। তাও অফিসটা আছে বলেই আসবার পথে একটু ভালোমন্দ খাওয়া যায়। অবসর নিলে সব শেষ।
আলোটা নিভিয়ে আবার শুয়ে পড়ে তপেন। কিন্তু আবার সেই আওয়াজ। এবার আওয়াজটা বেশ স্পষ্ট। টিনের কিছুতে পা লাগার আওয়াজ। না, এ ইঁদুরের কাজ নয়। তাহলে ?
-“কে ? কে ওখানে ?”
কোনও উত্তর পাওয়া যায় না। তপেন আবার প্রশ্ন করে, “কে ওখানে ? আমি কিন্তু তোমাকে দেখেছি।”
-“এ কি বলেন কত্তা, মিছেকথা বললি পাপ হয়।” একটা খুনখুনে গলা কানে আসে।
-“সে যাইহোক, এখন বল তুমি কে। কি মতলব তোমার ?”
অন্ধকার হতেই গলা ভেসে আসে, “মতলব আর কি থাকতে পারে বাবু, এসেছিলাম দুটো ঘটিবাটির আশায়। তা সে ভাগ্যি কি আছে আমার। ”
-“মানে চুরি করতে… ” গম্ভীর গলায় বলে তপেন। লোকটা নির্বিকার গলায় বলে, “সি বলতি পারেন। পেটের জন্যি কত লোক কত কি করে। চুরি তো চুরি, খুন জখম করতিও হাত কাঁপে না মানুষের।”
-“বল কি হে, ছুরিটুরি আছে নাকি তোমার কাছে ?”
লোকটা খিকখিক করে হেসে বলে, “সি আছে। ধরেন পাইপগানও আছে। যখন যে অস্তর কাজে লাগে। ন্যাতারা গরীবের ঘর খায় পায়খানা খায়, মানুষের মনুষ্যত্বও খেয়ি ফেলে। নেতা-মন্ত্রী-আমলারা ঘুষ খায়, ডাক্তার চিকিৎসার নামে পকেট কাটে, ইঞ্জিনিয়ার কমিশন খায়, ওষুধের দোকানদার তিনটাকার ওষুধ তিনশ’টাকায় বেচে, আর আমাদের মতো পাব্লিক ? সি শালোরা খাবার জন্যি ওঁত পেতে থাকে, — বাবুদের এঁটোকাটা যদি পায়। এ দুনিয়ায় কে সৎ বলতি পারেন ? ওজন্যিই আর ট্যারাবেঁকা পথে যেয়ি সময় নষ্ট করিনি। সোজা রাস্তা আমার।”
ভয়ে তপেনের পেট গুড়গুড় করতে থাকে। সে স্ত্রীকে ঠেলা মেরে জাগানো চেষ্টা করে, কিন্তু বারকয়েকের চেষ্টায় বিফল হয়ে মনে মনে গজগজ করতে করতে বলে,”যেমন বাপ আকাট তেমনি আমাকে আরেকটা আকাট গছিয়ে দিয়েছে। স্বামী এখন যমের মুখে আর কলিযুগের সাবিত্রী নাক ডাকছেন।”
-“এ যুগের সত্যবানরা আর বাঁচবেনি গো কত্তা।” আবার খিকখিক করে হেসে উঠল লোকটা, “এই আমাকেই দেখেন না, বউ বলল, — চেন্নাই যাও, ঘর করব সোনা গড়াব। তো লে গড়া সোনা। শালো স্বামীটই আটকে গেল। দিনকতক কাঁদবে, তারপর আরেক চেন্নাইওয়ালা ধরে ঝুলে পড়বে। সি তো আর আমাদের কষ্ট বুঝবে না কত্তা। টেন নাই, বাস নাই, হেঁটে হেঁটে আসতে যে কি কষ্ট । ”
-“তুমি বুঝি চেন্নাই গিয়েছিলে ? তা এলে কবে ?”
লোকটা বিষন্ন গলায় বলল, “আর আসা। দেশে ফিরতেই বললে করুনা হইছে। বললাম, করুনা হইছে তো কিছু টেকাপয়সা দেন। বলে কি, ‘ই সে করুনা লয় রে, ই যমের করুনা । তোকে চুলের মুঠিতে ধরবে আর লি’যাবে ।
সুস্থ সমত্ত শরীর, করুনা বলে দেগে দিলে, ভরি দিলে একটা খোয়াড়ে। জল নাই, ওষুধ নাই, ডাক্তারবাবুরা দেখে দশহাত দূর হতে। শরীরে কিছুই ছিল না কত্তা, অটালে মরে গেলাম।”
-“মরে গেলাম মানে ?” আঁতকে ওঠে তপেন।
লোকটা ধরাটে গলায় বলে, “খুব খিদে নিয়ে মরেছি কত্তা, খুব খিদে। তাই কোথাও খাবারের গন্ধ পেলেই মনটা হাঁকুপাঁকু করে। চোর ছ্যাচর আমি নই, আর আমার কাছে অস্তর শস্তরও নাই। যদি অনুমতি দ্যান তো…. ”
চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে এল তপেনের। অনুমতি না দিয়ে পারল না। লোকটা ফ্রিজ খুলে মহানন্দে খেতে লাগল।
সকালবেলা পাড়া মাথায় করে তুলল সীমা, তপেনের বৌ। অভিযোগের তীর স্বামীরত্নটির দিকে। রাতেরবেলা ফ্রিজ খুলে মিষ্টিগুলো খেয়েছে। এমনকি মাসতুতো ভাইয়ের জন্মদিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাখা কেকটাও নেই।
কাজটা যে কালকে রাতের সেই ভৌতিক লোকটা করেছে তা কোনোভাবেই বোঝাতে পারে না তপেন। এদিকে পেটটাও কেমন ভারভার লাগছে। বার কয়েক ঢেঁকুর উঠল। সেদিকে তাকিয়ে সীমা বলল, “বাঃ…”
0 Comments