প্রদীপের নীচে অন্ধকার

 

মৈত্রেয়ী সিংহরায়

প্রদীপের নীচে অন্ধকার // মৈত্রেয়ী সিংহরায়

কলিংবেল বেজে ওঠে। শ্বেতা কাজের মেয়েটিকে বলে ” লতা দেখতো কে?” লতা
এই একমাস হলো শ্বেতার বাড়িতে কাজ করছে। লতা দরজা খোলে, বাইরে থেকে বলে–
“বৌদি আমি বিকাশ। দাদা নেই? কেবলের
পয়সা নিতাম”।
শ্বেতা বলে “না গো। কত পয়সা দিতে হবে বলতো, আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
লতার হাতে বিকাশ বিলটা দেয়। শ্বেতা পয়সা মিটিয়ে দিলে বিকাশ চলে যায়।
লতা চা রুটি নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে মেঝেয় বসে। বলে ” ছেলেটিকে চেনো বৌদি?”শ্বেতা অবাক হয়ে যায় ” কেন চিনব না?ও তো বিকাশ।” লতা রুটি চিবোতে চিবোতে বলে বিকাশ তো বুঝেছি কিন্তু ও কে চেনো কি?” শ্বেতা অবাক হয়ে যায়। বলে “কে শুনি?”
লতা শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে ” ওই যে গো বিধবা মাগীটা, যে সালোয়ার কামিজ
পরে বেড়ায়,ওর ছেলে।” শ্বেতা বেশ বিরক্ত
হয়, বলে ” লতা তোমাকে কতবার বলেছি
খারাপ কথা বলবে না। একটা কথা যদি তোমার কান ঢোকে! আর সালোয়ার কামিজ পরেছে তো কি হয়েছে শুনি! ওর ইচ্ছে হয়েছে ও পরেছে।”
লতা সামলে নিয়ে বলে “তুমি শুধু শুধু রাগ করছ বৌদি। আচ্ছা ঠিক আছে আর কোনোদিন খারাপ কথা বলব না। কিন্তু আমার কথাটা তো শোনো।”
শ্বেতা বলে ” মনে থাকবে তো! আচ্ছা কি বলবে বলো।” লতা চোখ বড় বড় করে বলে
” তুমিও শুনলে অবাক হয়ে যাবে। ও বিধবা
কিন্তু মাছ, মুরগির মাংস সব কিছু খায়!”
শ্বেতা সত্যিই অবাক হয়ে যায়। যেন ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। এখনো মানুষের মন থেকে এসব মোছেনি। বৃথাই
নারী স্বাধীনতার কথা বলা! বলে ” তাতে কি হয়েছে? আর তাছাড়া তুমি কি করে জানলে?”
লতা সাগ্রহে বলে ” কেন? পাড়ার
সবাই বলে। ভদ্রলোকেরাও বলে।” শ্বেতা একটু বিরক্ত হয় বলে “কি বলে পাড়ার সবাই?”
লতা আমতা আমতা করে বলে “না বাবা
বলব না,তুমি আবার রাগ করবে!”
শ্বেতা বলে ” আরে বলই না। রাগ করব না।”
লতা বলে ” সবাই বলে বিধবা মাগী, ঢঙ্ দেখো সালোয়ার কামিজ পরে ঘুরছে। আবার মাছ মাংস খাচ্ছে। বিকেল হলেই আবার নাকি এগরোল চিকেন রোল খায়!”
শ্বেতা কয়েক মিনিট থামে। তারপর বলে “আচ্ছা লতা তুমিও তো বিধবা। তোমার ইচ্ছে করে না মাছ খেতে? তুমি মাছ মাংস খাওনা বলে আমার খুব কষ্ট হয়। আমাদের মাছের এঁটো বাসনগুলো তুমি রোজ মাজো।” লতা বৌদির কথাগুলো শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মনে মনে বলে ইচ্ছে করে, খুব ইচ্ছে করে বৌদি। তুমি যেদিন বললে তোমাদের মাছে বিড়ালে
মুখ দিয়েছে ফেলে দিতে। আমি ফেলিনি জানো। চুপি চুপি মাছগুলো খেয়ে নিয়েছিলাম। কেউ জানতে পারেনি। আমাদের ছোটলোকদের ওই মরণ খেতে
পায়না অথচ এইসব নিয়ে বাড়াবাড়ি। তোমার মতো তো এমন করে কেউ আগে
বলেনি।
মুখে বলে “না না বৌদি আমাকে ওসব কথা বলো না। আমাকেও সবাই ওই বিধবা মেয়েছেলেটার মতো খারাপ কথা বলবে।”
শ্বেতা বেশ বিচলিত হয়। চেয়ারে বসে। লতার মুখ চোখ বেশ অন্যরকম লাগে।
ওর মনের ভেতরটা যেন পড়তে পারে। যেমন বুঝতে পারে কোন্ মেঘে বৃষ্টি হবে!
শান্তভাবে লতাকে বলে ” কেউ বলবে না। আচ্ছা লতা, যদি ধরো তোমার স্বামী বেঁচে থাকত আর তুমি মারা যেতে, তোমার স্বামী কি মাছ মাংস খেত না? নিশ্চয়ই খেত। ” লতা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে দাঁড়ায়।
লতার বৌদির কথাগুলো বেশ ভালো লাগে।
খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে “জানো বৌদি বিকাশই জোর করে বলেছে ওর মাকে মাছ খেতে।” শ্বেতা বলে “তবে! খুব ভালো ছেলে। আমি তোমাকে বলছি লতা তুমিও খাও। কিচ্ছু হবে না, বুঝলে?”
লতা বসে পড়ে শ্বেতার পায়ের কাছে। ওর কোলের ওপর হাত রেখে বলে ” জানো বৌদি খুব ইচ্ছে করে মাছ খেতে। আমার তো ছেলেমেয়ে নেই কে বলবে বলো আমাকে খেতে!” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
শ্বেতা লতার মাথায় হাত রাখে। একরত্তি
মেয়েটা জীবনের পরোয়া না করে মহাকাশে
চলে যাচ্ছে। তালিবানদের হুঙ্কারকে পরোয়া
না করে মেয়েগুলো নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে পথে নেমেছে। অথচ আজও প্রদীপের নীচে অন্ধকার।


Post a Comment

0 Comments